মাদক পরিস্থিতি ও যুব-সমাজ

0

 অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরীঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ড্রাগ হলো এমন বস্তু যা গ্রহণ করলে ব্যক্তির এক বা একাধিক কার্যকলাপের পরির্তন ঘটায়। একটা ড্রাগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে তার রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্যের উপর। এই ড্রাগ অপব্যবহারের কারণে রোগী তার রোগের জন্য ওষুধের গুণাগুণ পাওয়ার বদলে হয়ে যায় বিষ। তাই অনেক সময় বিষ স্বল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলে হয় ওষুধ, কিন্তু বেশি মাত্রা বা অযথা গ্রহণ করলে হয় বিষাক্ত বা শরীরকে নিস্তেজ করে, মৃত্যু ডেকে আনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির সূচনা হয়।

অপব্যবহার থেকে অভ্যাস, অভ্যাস থেকে আসক্তি। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী ও শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আর উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। তবে আরও বেশ কয়েকটি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটিরও বেশী টাকার মুদ্রা বিদেশ পাচার হচ্ছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ লাখ। কোন কোন সংস্থার মতে ৭০ লাখ, নব্বইয়ের দশকে যার পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ১০ লাখেরও কম, এবং মাদকসেবীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই যুবক, তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। ৫০ শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কিছুদিন আগেও যারা ফেনসিডিলে আসক্ত ছিল তাদের অধিকাংশিই এখন ইয়াবা আসক্ত। সম্প্রতি   ইয়াবা আমাদের দেশের তরুন যুবসমাজকে গ্রাস করেছে। প্রতিদিন যেমন ইয়াবা ধরা হচ্ছে তেমনি প্রতিদিন হাজার হাজার পিস ইয়াবা তরুনরা গ্রহণ করছে।

সিগারেট থেকে নেশা শুরু করলেও মাদকের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে শুরু হয়। বেশীর ভাগই শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের সহচর্যে ।মূলত মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুনরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জাড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে এ জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদক সেবীরা দিনে দিনে আরোও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

আমাদের দেশে কিশোর সন্ত্রাসীর ক্রমবর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তার মূল কারণ সম্ভবত নিহিত রয়েছে এখানেই। দেশের সর্বত্র স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পেছনেও মাদকাসক্তির ভূমিকা অন্যতম।

মাদকের নেশা এখন আলো ঝলমলে নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত প্রামেও এখন এর অবাধ বিচরণ।

অন্যদিকে সারাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে। আরও একটি ভংঙ্কর চিত্র হচ্ছে যে, সারাদেশের ছড়িয়ে পড়া ইয়াবার শতকরা ৮৫ ভাগই ভেজাল। যার ফলে এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্তরা নানান ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।তার মধ্যে কিডন, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আশির দশকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেলে এ সমস্যা মোকাবেলায় মাদকের অপব্যবহার, পাচার রোধ ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতার বিকাশ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮৯ জারি করা হয়।

অতঃপর ২ জানুয়ারি ১৯৯০ তারিখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ প্রণয়ন করা হয় এবং নারকটিকস এন্ড লিকার পরিদপ্তরের স্থলে একই বছর তৎকালিন রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ তারিখ  এ অধিদপ্তরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করা হয় এবং সর্বশেষ এ অধিদপ্তরকে একই মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অন্তর্ভূক্ত করা হয। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম: দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৩ (তিন)টি কর্মকৌশল বা পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে:

১) চাহিদা হ্রাস( Demand Reduction)

২)সরবরাহ হ্রাস(Supply Reduction)

৩) ক্ষতি হ্রাস (Harm Reduction)

সম্প্রতিককালে মাদকদ্রব্য জব্দের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় দেশে হেরোইন ও গাঁজার অপব্যবহার স্থিতিশীল রয়েছে। কোডিন মিশ্রিত ফেন্সিডিল এর অপব্যবহার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে মিথাইল এ্যামফিটামিন দ্বারা তৈরি ইয়াবা এর অপব্যবহার ও আটক বর্তমানে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।ইয়াবা মূলত: পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আমাদের দেশে আসে।

সম্প্রতি একটি লোমহর্ষক কাহিনী আমদের সকলের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেছে। কোন কোন পত্রিকার শিরোনাম ছিল- “নেশাগ্রস্থ যুবকের গুলিতে জোড়া খুন’, অন্যটি হলো “মাদকাসক্ত মেয়ে নিজ হাতে বাবা-মাকে খুন করলো” আরোও অন্যান্য খবর ছিলো-“ ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় খুন হলেন মা-বাবা” । এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ইতিপূর্বেই আমরা দেখেছি “মাদকাসক্ত দেবর খুন করল তার ভাবীকে” অথবা “মাদকাসক্ত ছেলের হাত থেকে বাচঁতে মা খুন করলেন ছেলেকে” অথবা “মদ, সিগারেট, পরকীয়া প্রেম ও সম্পদের মোহে স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রী।” সুতরাং মাদকাসক্তরা তাদের স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধকে হারিয়ে হয়ে উঠে বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল এক অস্বাভাবিক ব্যক্তি।

সুতরাং, এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, দেশে মাদকাসক্তির কারণে যুব সমাজের নিজেদের জীবন শুধু বিপন্ন হয় না, এতে গোটা পরিবার বা সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাছাড়া ইনজেকশন এর মাধ্যমে মাদক গ্রহণের কারণে দেশে এইডস আক্রান্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সমাজকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সমস্যার মাঝেও প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ সফলতা রয়েছে। তথাপিও কাঙ্খিত পর্যায়ে সফলতার উত্তরণ হয়েছে এমন দাবী করা যুক্তিসংগত হবে না । আজও সমাজের নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাদক সমস্যা । যার অভিশাপ থেকে যুব সমাজ মুক্ত হতে পারছে না। এ থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় হতে পারে:

১) অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট শাক্তিশালী করার জন্য বিভাগীয় শহর এবং সিটি কর্পোরেশনসমূহে র‌্যাব এর ন্যায় স্ট্রাইকিং ফোর্স সৃষ্টি করা ।

২) জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রয়োজন এনজিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি লিডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ।

৩) ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াকে মাদক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে সম্পৃক্ত করা।

৪) মাদকাসক্তদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে মাদকাসক্তির চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করা।

৫) সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারে জড়িত অতি দরিদ্রদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সেফটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।

৬) অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশম ও ঝুঁকিভাতা প্রবর্তন করা।

৭) কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ করা ।

৮) মাদক মামলা দ্রুত নিস্পত্তির জন্য পৃথক আদালত গঠন।

৯) মাদকের পাচাররোধে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃ্দ্ধি করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই তার বক্তৃতায়-সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সমাজে অসুস্থতা দেখা যাচ্ছে এই কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুব সমাজ আজ নানাভাবে বিপথগামী হচ্ছে। তাদের যদি আমরা ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সক্রিয় রাখতে পারি, তাহলে দেশ থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নিমূল করতে পারব। সেদিক লক্ষ্য রেখেই খেলাধুলা ও সংস্কৃতির উপর আরও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ‍এই কথাগুলো প্রধানমন্ত্রী এমন সময়ই বললেন যখন বাংলাদেশের যুবসমাজের একটি অংশ আজ বিপথগামী কেউ মাদকাসক্ত হয়ে জীবনকে ও পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্যদিকে কেউ জঙ্গি হয়েও দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে।এমন একটি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই ধরনের বক্তব্য শুণে আজ অনেকেই নিজ নিজ পরিবারের প্রতি নজর দিবেন— এটাই হবে আজকের দিনের প্রত্যাশা।

পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে দিন দিন ইয়াবা আসক্তদের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। আসক্ত তরুণ-তরুণীরা অধিকাংশ উচ্চ ও মাধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান । মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, মাদক ব্যবাসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, বেকারদের কর্মসংস্থান ও স্কুল কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

সেই সাথে মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তির চিকিৎসার সফল পর্যায়ে পরিবারের স্ত্রী, বাবা, মদের নেশার নেতিবাচক দিক এবং জীবনের সম্ভাবনাময় বিষয় গুলোকে তুলে ধরে প্রতিনিয়ত সহমার্মিতামূলক আচরণের মাধ্যমে তাকে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী করে তুলতে পারেন। এমনভাবে আচরণ করতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে যে, আমরা তাকে ভালবাসি, তার সুন্দর ও সুস্থ্য জীবনের জন্য আমরা সহযোগিতা করতে চাই। বেশীরভাগ মাদকাসক্তির Relapse হয় পরিবারের বৈরী এবং সন্দেহমূলক আচরণের কারণে। মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে সঠিক ভাবে পরিচর্যা করতে না পারলে যে কোন সময় তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। মাদকাসক্তি চিকিৎসায় ব্যাক্তির নিজ ও পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী।

সর্বোপরি, মাদকাসক্তি একটি সামাজিক সমস্যা, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, সেই সাথে যু্ক্ত হয়েছে জঙ্গি তৎপরতা এতএব এসব কিছুকেই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই নির্মূল করতে হবে। আসুন না, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সবাই এক হই, অন্তত:এই একটি ক্ষেত্রে আমরা সবাই দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই হাতে হাত ধরে কাজ করি।

লেখক : অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী

একুশে পদকপ্রাপ্ত ও শব্দ সৈনিক (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র)

সভাপতি: মানস

সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড

Email: prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

 

////সুত্রঃ একুশে টিভি.অনলাইন///

0total visits,0visits today

About Author

Leave A Reply