হায়রে ইতালিঃ মহাসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে কেড়ে নেয় জীবন

0
সুনামগঞ্জ অফিসঃ
দালাল! শিহরিত করে যে শব্দ। দালালদের খপ্পরে পড়ে জীবন গেছে লক্ষাধিক মানুষের। তবুও দালালদের লোভনীয় কথা আর মানুষের লোভী মানসিকতার কারনে দালালির শিকার হয়ে জীবন হারায় মানুষ। সম্প্রতি, সুনামগঞ্জের গোলাবগঞ্জ উপজেলার হাওরতলা গ্রামে আফজাল মাহমুদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ইতালি যাবার স্বপ্নে বিভোর ছিল সে। কিন্তু খবর এলো হাজারো মাইল দুরে কোন এক সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন তিনি।

তার চাচাত ভাই রাসেল আহমেদ বলছেন, “ও দালালের মাধ্যমে গেছিলো। গত ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইটে করে দুবাইতে নিছে। দুবাইতে সপ্তাহ-দশ দিন দুবাইতে রাখা হইছে। এর পরে তুর্কি। তার পর লিবিয়াতে পাঠাইছে।” দুই বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন আফজাল মাহমুদ। যার পরিবারের আরও অনেক পুরুষ সদস্য ইতিমধ্যেই ইতালি ও ফ্রান্সে থাকেন। বড় ভাইদের পথ ধরে তিনিও যাচ্ছিলেন। যাবার জন্য দেশি দালালদের বেশ বড় অংকের অর্থও দিয়েছিলেন। যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ইতালি যাচ্ছিলেন তার মধ্যে যে সমুদ্রও পাড়ি দিতে হবে সেই তথ্য কিছুই তারা জানতেন না বলছিলেন রাবেল আহমেদ।

তিনি বলছেন, “এই রকম তো আমরা কোনো দিন কল্পনাও করি নাই। দালালে আমাদের অনেক আশা দিছে। ভালো বিমানে দিবো বা ভালো সুযোগ সুবিধা দিবো। সুন্দরভাবে ইতালি পৌঁছাইব। পানির কোনো সিস্টেম নাই ওইভাবে পাঠান হইবো। পরে শুনি যে একটা ছোট্ট ট্রলারে দিছে। যার মধ্যে ৯০ থেকে ৮০ জন মানুষ আছিলো। কতক্ষণ পর ট্রলারটা চেঞ্জ করছে। তার কতক্ষণ পর সেটা ডুবি গেছে।” বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে এক নৌকা ডুবিতে নিহত প্রায় ৬০ জন অভিবাসীর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশি নাগরিক। সেই নৌকাতেই ছিলেন আফজাল মাহমুদ।

লিবিয়া, তুরস্ক হয়ে ইতালি অথবা গ্রীস, এই নামগুলোই বারবার আসছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক অথবা সাব সাহারা অঞ্চলের কিছু দেশের অধিবাসীরা এই রুট ব্যবহার করে। সেটাই ছিল প্রবণতা।

কিন্তু বাংলাদেশিরা হাজার মাইল দুরের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার এই পথ কেন বেছে নিচ্ছেন?

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলছেন,  “২০১০ সালের দিকে প্রচুর বাংলাদেশি লিবিয়াতে কাজ করতো। লিবিয়াতে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন অনেকেই বাংলাদেশে চলে আসেন। ৩৭ হাজারের মতো। আর একটা বড় অংশ যারা আসতে পারেননি তখন তারা কোনও না কোনভাবে ইউরোপ ঢোকার চেষ্টা করে। তখন থেকেই ওই পথটা খুব পপুলার হয়ে ওঠে। মানব-পাচার চক্র গড়ে ওঠে যারা বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া তারপর ইউরোপ নিয়ে যাবে। এখনো তারা এই ঝুঁকিটা নিচ্ছে।”

আইওএমের ২০১৭ সালে একটি জরীপে দেখা গেছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে যেসব দেশের নাগরিকেরা বাংলাদেশিরা রয়েছেন সেরকম প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান বিষয়ক পরিদপ্তর ইওরোষ্ট্যাটের তথ্যমতে ২০১৪ সালের পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যেসব দেশের নাগরিকেরা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করেছে সেরকম প্রথম দিকের দশটি দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশ রয়েছে।  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তর সচিব মানব-পাচার বিরোধী টাস্কফোর্সের ফোকাল পয়েন্ট আবু বকর ছিদ্দীক বলেন,ইউরোপ যেতে পারলেই যেন ভাগ্য খুলে যাবে তরুণ প্রজন্মের এমন একটা মনোভাবেই তাদের জীবনের এই সর্বনাশ ডেকে আনে।

তিনি বলছেন, ” কোন লিগাল কাগজপত্র থাকে না তবুও তারা যাবেই। এমনও লোক আছে যে পাঁচ বছর ধরে যাচ্ছেই। জার্মানি পর্যন্ত তার যেতেই হবে। সে প্রথম গিয়েছে ইরাক। সেখান থেকে সিরিয়া, সেখান থেকে ইস্তাম্বুল, সেখান থেকে গ্রীস। এভাবে বিভিন্ন যায়গায় সে আটকা পড়েছে জেল খেটেছে, আবার ট্রাফিকারদের টাকা দিয়েছে। বাঁচুক আর মরুক জার্মানি যেতে হবে। দেখা গেলো সেখানেও যে এসাইলামও পায়না। মানবেতর জীবনযাপন করে।”

তার মতে, “আপনি এইখান থেকে ঠেকাতে পারবেন না। লিবিয়া থেকে ঠেকাতে হবে। যারা যাচ্ছে তারা লিবিয়া থেকে যাচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক মানব-পাচারকারী যে চক্র তার পেছনে অনেক বড় বাণিজ্য রয়েছে। আমাদের আন্তরিকতা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন কিন্তু লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার যে চেষ্টা সেখানে বাংলাদেশ সরকার বা দূতাবাস খুব শক্ত ভূমিকা নিয়ে প্রতিহত করতে পারবে এমনটা ভাবাটা আসলে সম্ভব না। আন্তর্জাতিকভাবেই আমাদের এক হয়ে কাজ করতে হবে।”

ক্রাইম ডায়রি//সুত্র : বিবিসি/ক্রাইম/// স্পেশাল

14total visits,3visits today

About Author

Leave A Reply