পরিবেশ দুষণ রোধঃ সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবী

0

আতিকুল্লাহ আরেফিন রাসেলঃ

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে পৃথিবীতে ঘটতে পারে নানা দূর্ঘটনা।  হতে পারে প্রলয়ংকারী ভুমিকম্প কিংবা হতে সুনামির মত ঘটনা কিংবা বণ্যা জলোচ্ছাস,খরা কিংবা অজানা রোগের সৃষ্টি।  কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে যে প্রাণ ও প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন প্রকৃতি ও পরিবেশে সাম্য ছিল। এ ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা ছিল প্রকৃতি ও পরিবেশের। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের পথ ধরেই মানুষ একটু একটু করে গড়ে তুলেছে নিজের পরিবেশ। মানুষের রচিত পরিবেশ তারই সভ্যতার বিবর্তন ফসল। মানুষ তার নতুন নতুন আবিষ্কারের প্রতিভা, পরিশ্রম আর দক্ষতা দিয়ে সংগ্রহ করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন পদ্ধতি। অধিগত করেছে জীবন-বিকাশের নানা উপকরণ। তাই দিয়ে সে তার নিজের প্রয়োজন ও রুচি অনুযায়ী তৈরি করেছে তার পরিবেশ। এ পরিবেশের মধ্যেই তার বিকাশ, তার বিনাশের ইঙ্গিত। এছাড়া  অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ক্রমাগত ঢাকা শহরের বিল্ডিং দুষণ কিংবা বদ্ধ আবহাওয়া ক্রমাগত জীবিতমৃত্যুর মিছিল বাড়িয়েই চলেছে।  জনসংখ্যা বৃদ্ধি পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ জল, মাটি, বায়ুর ওপর পড়েছে প্রচণ্ড চাপ। শুরু হয়েছে বন সম্পদ বিনষ্টের অমিত উল্লাস। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উদ্ভিদ জগৎ ও প্রাণী জগৎ। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য এসে পৌঁছেছে এক সংকটজনক অবস্থায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান হারে শক্তি উৎপাদনের চাহিদা। শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে নির্গত হয় মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ-দূষক নানা রাসায়নিক দ্রব্য। দূষিত রাসায়নিক দ্রব্যই নানা দুরারোগ্য ব্যাধির দ্রুত প্রসারণের কারণ। এতে বায়ু-জল-খাদ্যদ্রব্য মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। সমস্যায় জর্জরিত এদেশের মৌলিক সমস্যা হচ্ছে  বায়ু দুষণ। বাংলাদেশের বায়ু দূষণমুক্ত নয়। এই সমস্যা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বায়ু দূষণে পিছনে প্রধানত দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত: কলকারখানার ধোঁয়া এবং দ্বিতীয়ত: যানবাহনের ধোঁয়া। সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট এবং টেক্সটাইল মিল, টেনারীজ, গার্মেন্টস, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত হয়। বাংলাদেশে কতিপয় শিল্প যেমন হাজারীবাগের ট্যানারী, এমিট হাইড্রোজেন সালফাইড, এ্যামোনিয়া প্রভৃতি কেমিক্যাল থেকে সৃষ্ট বিষক্রিয়া থেকে মাথা যন্ত্রণাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।


দেশে ক্রবর্ধমান নগরায়ণ, অধিকহারে যানবাহন বৃদ্ধি বায়ু দূষণে ভূমিকা রাখছে। বেবি ট্যাক্সি, টেম্পু, মটর সাইকেল, ট্রলি প্রভৃতি টু-স্ট্রোক যাননবাহন থেকে অধিক ধোঁয়া নির্গত হয়। এছাড়া ঢাকা শহরের ৯০% যানবাহন পুরনো।  যার কালো ধোয়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সম্প্রতি সরকার ২০ বছরের অধিক পুরাতন যানবাহন নিষিদ্ধের সিদ্ধন্ত নিয়েছে।
বায়ুতে বিভিন্ন গ্যাসের স্বাভাবিক উপাদান হচ্ছে: ইট্রোজেন ৭৮.০৮৪% অক্সিজেন ২০.৯৪৬% আর্গন ০.৯৩৪০% কার্বন-ডাই-অক্সাইড ০.০৩৮৩%
নিয়ন ০.০০১৮১৮% হিলিয়াম ০.০০০৫২৪% মিথেন ০.০০০১৭৪৫% ক্রিপ্টন ০.০০০১১৪% হাইড্রোজেন ০.০০০০৫৫% নাইট্রাস অক্সাইড ০.০০০০৩
স্বল্প মেয়াদে সমস্যা :
বায়ু দূষণের কারণে স্বল্প মেয়াদে চোখ ও নাকে ব্যাথা হয়। এছাড়া ব্রন্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্নক রোগ হয়।
দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা : বায়ু দূষণের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা এমনকি ব্রেইন, নার্ভ, লিভার ও কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বায়ু দূষণের স্বাস্থ্য সমস্যা : বায়ু দূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী দুইভাবে আক্রান্ত করতে পারে। কেউ বায়ু দূষণ থেকে মুক্ত নয় তবে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ক্ষতির শিকার। বায়ু দূষণের কারণে মানুষের এ্যাজমা, হার্ট ও ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়।
বায়ু দূষণের কারণে স্বল্প মেয়াদে চোখ ও নাকে ব্যাথা হয়। এছাড়া ব্রন্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্নক রোগ হয়।
দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা : বায়ু দূষণের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা এমনকি ব্রেইন, নার্ভ, লিভার ও কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
পানি দূষণ: পানির অপর নাম জীবন। মানুষের শরীরের ৬৫% পানি। পৃথিবীর ৭১% পানি। কিন্তু প্রতিনিয়ত পানি দূষণের কারণে খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। দূষিত পানি পান করার ফলে বিভিন্ন জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে।
পানি দূষনের কারণ: বাংলাদেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিভিন্নভাবে পানি দূষিত হচ্ছে। নিম্নে পানি দূষণের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো :
শহরাঞ্চলে : শহরে পানির সর্বরাহ হয় মূলত পার্শ্ববর্তী নদীগুলো থেকে। নদীর পানি বিশুদ্ধ করে খাওয়া ও ব্যবহার উপযোগী করা হয়। শহরে যেসকল কারণে পানি দূষিত হয় সেগুলি হচ্ছে-
1. কলকারখানার বর্জ্য নদীতে মিশে পানি দূষিত হয়।
2. ওয়াসার পানির লাইনের উপর অবৈধ পয়নিষ্কাষণের ব্যবস্থা এবং এগুলি পানিতে মিশে পানি দূষিত করে।
3. অনেক সময় পানির লাইন ফেটে যেয়ে এর ভিতর ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে। এর ফলে পানি দূষিত হয়।
গ্রামাঞ্চলে : গ্রামাঞ্চলে খাওয়া ও ব্যবহারের জন্য মানুষ নলকূপ, পুকুর ও জলাশয়ের পানি ব্যবহার করে। বিভিন্নভাবে এই পানি দূষিত হচেছ। কারণসমূহ নিম্নে দেওয়া হলো:
1. নলকূপের পানিতে আর্সেনিক গ্রামে পানি দূষণের প্রধান কারণ।
2. ফসলের ক্ষেতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানিতে তা পুকুর, জলাশয়ের পানিতে মিশে পানি দূষিত হয়।
3. একই পুকুরে কাপড় পরিষ্কার, মানুষ ও গবাদী পশুর গোছল করালে পানি দূষিত হয়।
এভাবে শহর ও গ্রামে পানি দূষিত হয় এবং খাওয়া ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে।
পানি দূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি: পানি দূষণের কারণে বিভিন্ন ধরণের পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যেমন-
পানিবাহিত রোগ: ডায়েরিয়া
ব্যাকটেরিয়াজনিত: টাইফয়েড
সংক্রমন : কলেরা, প্যারাটাইফয়েডজ্বর ও বেসিলারী আমাশয়
ভাইরাল সংক্রমণ(জন্ডিস) : পোলিওমাইলিটিস হেপাটাইটিস সংক্রমণ
প্রোটোজল সংক্রমণ: অ্যামোবিক আমাশয়


শব্দ দূষণ এ যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ, জলজ্যান্ত সমস্যা। দিন দিন এ সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শহরে শব্দ দূষণের মাত্রা সর্বাধিক। প্রতিনিয়তই এখানে মোটরগাড়ির হর্ন, কলকারখানার বিকট আওয়াজ, বাজি পটকার শব্দ, রেডিও, টেলিভিশনের শব্দ, লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচি, উৎসবের মত্ততা, মাইকে চড়া সুর, সব মিলেমিশে এক অপস্বর সৃষ্টির মহাযজ্ঞ চলছে। শব্দ দূষণের পরিণাম ভয়াবহ।
শব্দ দূষণের উৎস অনেক এবং অনেক ধরনের। যথাযথ কারণ ছাড়া যত্রতত্র মাইক বা ক্যাসেট প্লেয়ার বাজানো বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো এবং হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো আইনগতভাবে বন্ধ করতে হবে। আবাসিক এলাকায় যাতে কলকারখানা গড়ে উঠতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। বন ও পরিবেশ আইন ১৯৯৭ অনুসারে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শব্দ দূষণ রোধে মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা এখন শব্দ দূষণের নগর। ২০০৩ সালে দুই স্ট্রোকবিশিষ্ট অটোরিকশা ঢাকা শহর থেকে উঠিয়ে দেওয়ার পর বায়ু দূষণের পাশাপাশি শব্দ দূষণের মাত্রাও অপেক্ষাকৃত কমে যায়, ফলে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু তাদের সে স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। শব্দ দূষণের ফলে যে অসুখ হয়, তার মেয়াদ দীর্ঘমেয়াদি হয় বলে মানুষ তৎক্ষণাৎ এর কুফল বুঝতে পারে না। তাই এদিকে মানুষের নজরও থাকে কম। এ কারণে ঢাকার আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন, কারখানার উচ্চশব্দ, মাইক ও সিডি প্লেয়ারের উদ্দাম আওয়াজ থেকে।
শব্দ দূষণের ভয়াবহতা: শব্দ দূষণ যে শুধু বিরক্তি সৃষ্টি করে তাই নয়, মানবদেহের আর্টারিগুলো বন্ধ করে দেয়, এড্রনালিনের চলাচল বৃদ্ধি করে এবং হূৎপিণ্ডকে দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করে। ধারাবাহিক উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শব্দ দূষণ স্নায়বিক বৈকল্যের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধারাবাহিক শব্দ দূষণ শ্রবণশক্তি নষ্ট করে এবং স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে। তাঁদের মতে, রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের হার্ট, কিডনি ও ব্রেনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। শব্দ দূষণে শিশুদের মেজাজ হচ্ছে খিটখিটে। তারা শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে, হারাচ্ছে তাদের একনিষ্ঠতা। এর প্রভাব তাদের লেখাপড়ার ওপর পড়ছে। সব ধরনের শব্দ দূষণের ফলেই মানুষের ঘুম, শ্রবণশক্তি, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। যেকোনো ধরনের শব্দ দূষণই গর্ভবতী মায়েদের ক্ষতি করে দারুণভাবে। শব্দ দূষণে মানুষের স্থায়ী মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে।
তেজস্ক্রিয় দূষণ: পারমাণবিক যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে তেজস্ক্রিয় দূষণের বিপদ সবচেয়ে বেশি নিহিত। ১৯৬৩ তে একটি মার্কিন নিউক্লিয় সাবমেরিন আটলান্টিক সাগরে হারিয়ে যায়। তা থেকে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে। নিউক্লিয় জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রের আবর্জনা তার ক্ষতিকারক ক্ষমতা নিয়ে ৬০০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
পরিবেশ দূষন রোধের উপায়:
মানুষ পরিবেশের অংশ এবং প্রত্য সুফল ভোগকারী। পরিবেশ বিপর্যস্ত হলে মানুষই তিগ্রস্থ হয়, মানুষের ব্যবহার্য প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হয়, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়। তাই সুস্থ্য শরীর ও মন বিনির্মাণে বিপর্যয়মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন। পরিবেশ সংরনে ও দূষণ রোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে; তাহল-
1। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতি প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
2। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য হ্রাস এবং নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
3। পরিবেশ দূষনের সম্ভাবনা রয়েছে এরূপ প্রতিটি শিল্প-কারখানার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
4। ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচী প্রনয়ন করা।
5। শব্দ দূষন রোধে শব্দ নিয়ন্ত্রন এবং সুনাগরিকতার বিকাশ ঘটানোর জন্য জনসচেতনা সৃষ্টি।
6। শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
7। জ্বালানী হিসেবে কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। বিকল্প জ্বালানী উদ্ভাবন করা।
8। সঠিক রনাবেনের মাধ্যমে যানবাহন থেকে কালো ধোয়া নির্গমন বন্ধ করা এবং উচ্চ শব্দযুক্ত হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
9। পরিবেশ সংরনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়াসে রাজনৈতিক অঙ্গীকার সুনিশ্চিত করা।
10| সড়কে যানজট বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ দূষণ, দূর্ঘটনাসহ নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

পাশাপাশি ক্রমগতভাবে নতুন নতুন সড়ক বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে, সড়ক পথের ব্রিজ ও কালভার্টের কারণে নৌ-যোগাযোগ ব্যহত এবং জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি হচ্ছে। নদী মাত্রিক বাংলাদেশের নৌ-পথ ধ্বংস হওয়ার পিছনে অনেকেই অপরিকল্পিত সড়ক তৈরি বিষয়টিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। অপর দিকে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হলে স্বল্প জায়গায় কম জ্বালানি ও পরিবেশ দুষণ করে অধিক যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সম্ভব হতো। ভবিষ্যতে জ্বালানী সংকট মোকাবেলা, কৃষি জমি রক্ষা, পরিবেশ দূষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রধান্য দিয়ে যাতায়াত ব্যবস্থায় রেলকে অগ্রাধিকার প্রদান করা প্রয়োজন।
সুতরাং পরিবেশকে দূষনমুক্ত রাখতে হলে আমাদেও সম্মিলিত প্রচষ্টা প্রয়োজন।

পরিবেশ দুষণ মুক্ত রাখতে ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বৃক্ষ রোপনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বৃক্ষহীনতায় প্রকৃতি আজ দিশেহারা। একটি দেশের জন্য তার আয়তনের তুলনায় শতকরা পচিশ ভাগ বনভুমি প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে বনভূমি ছিল ১৬ ভাগ। নব্বইয়ের দশকে ছিল ৭/৮ভাগ। আর এখন কি তা বলার দরকার আছে কি???

  আসুন দেখি বৃক্ষের কি  ভূমিকা?? 

খাদ্যের উৎস, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিত্তবিনোদন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন প্রকার ফল, মিষ্টি রস, ভেষজ দ্রব্য, কাঠখড়িসহ অনেক মূল্যবান সম্পদ পাই। বিভিন্ন প্রকার ফল উৎপাদনে বৃক্ষের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ফল শারীরিক ও মানসিক পরিপূর্ণতা বিকাশ লাভে সহায়তা করে। বিভিন্ন প্রকার কাঠের ওপর ভিত্তি করে দেশে আসবাবপত্র তৈরির বৃহৎ শিল্প, যেমন- বনজ শিল্প, হাতিল, আকিজ, নাভানা, অটোবি ইত্যাদি এবং কাঠমিস্ত্রিদের দ্বারা ক্ষুদ্র ফার্নিচার শিল্প গড়ে ওঠেছে। সমগ্র বিশ্বে বৃক্ষভিত্তিক বৃহৎ শিল্প, যেমন- কাগজ, রাবার, রেয়ন, হার্ডবোর্ড, রেশম, চা, পামঅয়েল, কোকো ইত্যাদি এবং কুটির শিল্প, যেমন- আগর, রেজিন, লাক্ষ্মা, খয়ের, মধু, বাঁশ-বেত শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটছে। তাল-খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি হয়। এ রসের ওপর ভিত্তি করে যশোর, ফরিদপুর, নাটোর, রাজশাহী অঞ্চলে গুড়ভিত্তিক গ্রামীণ শিল্পের প্রসার ঘটেছে। নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে গদি, জাজিম, পাপস, রশি, ব্রাশ, ঝাড়– এবং তাল-খেজুরের পাতা দিয়ে পাটি, থলে, বেড়া, ঘরের ছাউনি ও কাণ্ড ঘরের বর্গা-খুুঁটি তৈরিতে ব্যবহƒত হয়। শিমুলগাছের তুলা দ্বারা লেপ, তোষক, বালিশ, সুতা ইত্যাদি তৈরি হয়। বৃক্ষের ডালপালা ও পাতা জ্বালানির প্রধান উৎস। দুনিয়ার সব রোগের ওষুধ রয়েছে উদ্ভিদের মধ্যে। ভেষজ বৃক্ষের শেকড়, ছাল-বাকল, পাতা, ফুল, বীজ ও বিভিন্ন প্রকার ফল, যেমন- আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, অর্জুন, নিম ইত্যাদি আয়ুর্বেদিক/হারবাল/ইউনানি ওষুধ তৈরির প্রধান উপাদান। হেকিম ও কবিরাজরা ভেষজ ওষুধ দ্বারা সর্দি-কাশি, জ্বর, ব্যথা, হাড়ভাঙ্গা, আমাশয়, কৃমি, বাত, সাদা শ্রাব, সুতিকা, মেহ-প্রমেহ, ডায়াবেটিস, প্রেসার, জন্ডিস, পাইলস, একজিমা, দুধবাহারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করেন। ভেষজ ওষুধ দ্বারা গবাদি-পশুরও চিকিৎসা হয়। দেশে হামদর্দ, সাধনা, শক্তি, এপি, কুণ্ডেশ্বরীসহ বহু আয়ুর্বেদিক ওষুধ শিল্প গড়ে উঠেছে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকায় মানুষের এসব ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। হারবাল প্রসাধনীর প্রধান উৎস বৃক্ষ। অনেক গাছের পাতা-ছাল-শেকড়-বীজ দ্বারা জৈব বালাইনাশক তৈরি হয়। বহু মূল্যবান ঔষধি বৃক্ষ বিলুপ্তির কারণে ভেষজ পণ্য আমদানি করতে হয়। তাই ঔষধি বৃক্ষ সংরক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যেগ একান্ত প্রয়োজন। বৃক্ষরাজি বাতাস থেকে CO2 শোষণ এবং অক্সিজেন (O2) ত্যাগের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। একটি বয়স্ক বৃক্ষ ১০ জন মানুষের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে। বাতাস থেকে ৬০ পাউন্ডের অধিক বিষাক্ত গ্যাস শোষণ ও ১০টি এসির সমপরিমাণ তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। শত শত টন কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুর দূষণরোধ ও তাপদাহ দুপুরে প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসে প্রায় ১০০ গ্যালন পানি নির্গত করে পরিবেশ ঠা-া রাখে। বৃক্ষরাজি শব্দ দূষণও রোধ করে। এক হেক্টর পরিমাণ মাঝারি বন ১০ ডেসিবল শব্দ হ্রাস করতে পারে। সর্বোপরি সবুজ বৃক্ষের মনোরম দৃশ্য ও নির্মল বাতাস সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ সব মানুষের চিত্তবিনোদনের আকর্ষণীয় উপাদান। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য যে কোনো দেশের ২৫% ভূমিতে বনজঙ্গল থাকা দরকার। বর্তমানে দেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারিভাবে ১৭% উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তবে রয়েছে ৮-১০% ভাগ। প্রতি বছর দেশে ১.৪৭% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতি স্থাপন এবং শিল্পায়নের ফলে ১% হারে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস ও ৩.৩% হারে বন নিধন হচ্ছে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে নিম্নের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা মানব সম্প্রদায়েরই করণীয়- ১. সড়কপথ, রেলপথের দু-ধার, পাহাড়, টিলা, উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা, নদ-নদী, খাল-বিলের পাড়, বাঁধ, বেড়িবাঁধ, হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ির আশপাশে ফাঁকা জায়গায় প্রচুর পরিমাণে ফলদবৃক্ষ, যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কুল, আমড়া, জলপাই, পেয়ারা, আতা, সফেদা, কমলা, লেবু, বেল, কদবেল, ডাউয়া, করমচা, চালতা, জাম্বুরা, জামরুল, শরিফা, কামরাঙা, গোলাপজাম, তেতুল, সজনা, নারিকেল, সুপারি, তাল, খেজুর, পামঅয়েল, গোলপাতা ইত্যাদি, বনজবৃক্ষ, যেমন- সেগুন, মেহগণি, আকাশমণি, কড়ই, রেইনট্রি, বাবলা, গর্জন, শাল, চিকরাশি, শিশু, গামার, জারুল, দেবদারু, শিমুল, বট, পাকুর, খয়ের, হিজল, তরুল, চন্দন, কদম, ঘোড়ানিম, ছাতিয়ান ইত্যাদি ভেষজবৃক্ষ, যেমন- আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, অর্জুন, জাতনিম, নিশিন্দা, বাসক, শতমূল, অ্যালোভেরা, নয়নতারা, কালমেঘ, সর্পগন্ধা ইত্যাদি ও মসলাজাতীয় বৃক্ষ, যেমন- তেজপাতা, দারচিনি, গোলমরিচ, জায়ফল, আলুবোখারা, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম ইত্যাদি রোপণ করে বাগান ও সামাজিক বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। ২. নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং বৃক্ষ কর্তনের ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। অবাধে পাহাড় কাটা, নদী ভরাট এবং বালু উত্তোলন রোধ ও আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। ৩. কাঠের ফার্নিচারের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক, লোহা ও স্টিলের তৈরি ফার্নিচার ব্যবহার করতে হবে। খড়ির বিকল্প হিসেবে চারকোল, গ্যাস, কয়লা ও ঘুটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত চুলায় কম ধোঁয়া নির্গমন ও অল্প খড়ির প্রয়োজন হয়। তাই এ চুলার ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। ৪. যানবাহনে সীসামুক্ত জ্বালানি ও সিএনজি ব্যবহার করতে হবে। শিল্পকারখানা এবং ইটভাটার চিমনি অনেক উঁচু করে তৈরি ও ধোঁয়া নির্গমণ হ্রাস করতে হবে। বিষাক্ত বর্জ্য ও ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসাবে পাটজাত ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে হবে। দূষণরোধে পলিথিন, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে। ৫. শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল, বিল ও নদীতে না ফেলে ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে শোধন করতে হবে। বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ডাস্টবিনের ময়লা-আর্বজনা এবং জৈব বর্জ্য দ্বারা বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন করতে হবে। বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফানশনাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন করে বর্জ্য বা আবর্জনাকে দ্রুত পচনশীল করার মাধ্যমে সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ৬. উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধ, বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো মজবুত করে তৈরি করতে হবে যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। লবণাক্ত পানি সহজে নিষ্কাশনের জন্য এক মিটার গভীর করে ড্রেন ও সাব ড্রেন তৈরি করতে হবে। জলাশয় তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যেন এ পানি শুষ্ক মৌসুমে ফসলের জমিতে ব্যবহার করা যায়। ৭. কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার ফসলের শীত, তাপ, বন্যা ও লবণসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এবং বালাইনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি জৈব কৃষির ওপর অধিক জোর দিতে হবে। ৮. নির্বিচারে বন্য ও জলজ প্রাণী শিকার বন্ধ করতে হবে। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য অভয়ারণ্য, উদ্ভিদ উদ্যান, অভয়াশ্রম, শিকার সংরক্ষিত এলাকা ইত্যাদি সৃষ্টি এবং বন-জঙ্গল, জলাশয়, নদী, সাগর দূষণমুক্ত রাখতে হবে। ৯. পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ ঘটানো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ১০. শব্দ দূষণরোধে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ ও বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন হওয়া শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ১১. শিল্পকারখানার সঙ্গে ইটিপি না থাকা দ-নীয় অপরাধ। তাই যেসব শিল্পকারখানার সঙ্গে ইটিপি নেই, সেগুলোর ওপর পরিবেশ দূষণের জন্য গ্রিনট্যাক্স বা দূষণকর আরোপ ও ইটিপি স্থাপনে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ১২. নিয়মিত Air Monitoring এর মাধ্যমে বায়ুদূষণের উপাদানগুলোর পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। ১৩. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোই বেশি দায়ী।

তাই ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ দেশগুলোর ওপর গ্রিনট্যাক্স, কার্বনট্যাক্স কার্যকর করে একটি অর্থ তহবিল গঠনের মাধ্যমে বিশ্ব পরিবেশ উন্নয়নে ওই অর্থ দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষকে অন্তত একটি বৃক্ষ চারা রোপণ ও পরিচর্যা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সর্বোপরি শিল্পায়ন বিশ্বকে করেছে অনেক উন্নত ও আধুনিক। তাই শিল্পায়নের অগ্রগতি বজায় রেখেই বিশ্ববাসীকে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে উদ্বুদ্ধ এবং পরিবেশবাদী সংগঠন ও মিডিয়াগুলোকে এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি কি?? নাকি আমরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে থাকব। আজ হয়ত আমরা বুঝছিনা। কিন্তু বুঝতে তো আমাদের হবেই। কারন কি জানেন, ডাক্তারদের কাছে গেলেই আমরা যত পরীক্ষ িনরীক্ষাই করাই না কেন,দেখা যায় যে কোন রোগই ধরা পড়ছে না। এর কারন কি??? এগুলো সবই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়া। সুতরাং সময় থাকতে সাধূ সাবধান।।।।

লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক , সাপ্তাহিক ক্রাইম ডায়রি ও সভাপতি , জাতীয় সাংবাদিক পরিষদ।

ক্রাইম ডায়রি///স্পেশাল/জাতীয়

34total visits,1visits today

About Author

Leave A Reply